সংঘাতের চার মাস

ইরান যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রে পরিবারপ্রতি অতিরিক্ত ব্যয় ১ হাজার ডলার

মধ্যপ্রাচ্যে ইরানকে ঘিরে চলমান সংঘাত শুধু যুদ্ধক্ষেত্রেই সীমাবদ্ধ নেই, এর অর্থনৈতিক প্রভাবও ক্রমে স্পষ্ট হচ্ছে।

গত ফেব্রুয়ারিতে যুদ্ধ শুরুর পর থেকে জ্বালানি তেলের উচ্চমূল্য, খাদ্যসামগ্রী এবং অন্যান্য নিত্যপ্রয়োজনীয় খরচের ধাক্কায় যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিটি পরিবারকে গড়ে প্রায় ১ হাজার মার্কিন ডলার অতিরিক্ত গুনতে হয়েছে। গবেষণা প্রতিষ্ঠান মুডি’স অ্যানালিটিকসের প্রধান অর্থনীতিবিদ মার্ক জ্যান্ডি গত সপ্তাহে তার বিশেষ প্রতিবেদনে এ তথ্য জানিয়েছেন। খবর সিবিএস।

মার্ক জ্যান্ডি জানান, ফেব্রুয়ারিতে ইরান যুদ্ধ শুরুর পর থেকে যুক্তরাষ্ট্রের পরিবারগুলো বিভিন্ন খাতে উল্লেখযোগ্য অতিরিক্ত ব্যয়ের মুখোমুখি হয়েছে। তার মতে, পরিবারপ্রতি অতিরিক্ত ব্যয়ের হিসাব এখনো বাড়ছে ও প্রকৃত ব্যয় বর্তমান অনুমানের চেয়েও বেশি হতে পারে।

সবচেয়ে বড় চাপ জ্বালানি খাতে

জ্যান্ডির বিশ্লেষণ অনুযায়ী, যুদ্ধের কারণে সবচেয়ে বেশি প্রভাব পড়েছে জ্বালানি খাতে। গত ২১ মে যুক্তরাষ্ট্রে প্রতি গ্যালন পেট্রলের গড় মূল্য বেড়ে ৪ দশমিক ৫৬ ডলারে পৌঁছায়। সম্প্রতি তা আবার ৪ ডলারের নিচে নামলেও যুদ্ধ শুরুর পর থেকে একজন মার্কিন নাগরিককে গাড়ির জ্বালানির জন্য গড়ে প্রায় ৩০০ ডলার অতিরিক্ত ব্যয় করতে হয়েছে।

বিশ্লেষকদের মতে, জ্বালানির দাম বাড়া সরাসরি ভোক্তাদের ব্যয়ের ওপর প্রভাব ফেললেও এর পরোক্ষ প্রভাব আরো বিস্তৃত। কারণ ডিজেলের মূল্যবৃদ্ধি পণ্য পরিবহন ব্যয় বাড়িয়ে দিয়েছে। কৃষিপণ্য, শিল্পপণ্য ও আমদানি পণ্য পরিবহনের ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় খুচরা বাজারেও দাম বাড়ছে।

প্রতিবেদনে বলা হয়, যুদ্ধ শুরুর পর থেকে জ্বালানি ব্যয় বাড়ায় একটি মার্কিন পরিবারকে শুধু খাবারের জন্য গড়ে প্রায় ২০০ ডলার অতিরিক্ত ব্যয় করতে হয়েছে।

মূল্যস্ফীতির কারণে কমেনি সুদহার

যুদ্ধের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক প্রভাব পড়েছে সুদহারের ওপর। চলতি বছরের শুরুতে যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় ব্যাংক ফেডারেল রিজার্ভ (ফেড) সুদহার কমাবে বলে আশা করেছিলেন অনেক বিনিয়োগকারী। কিন্তু যুদ্ধের কারণে জ্বালানি ও অন্যান্য পণ্যের দাম বাড়ায় মূল্যস্ফীতি বেড়ে যায়। ফলে সুদহার কমানোর পরিকল্পনা বাস্তবায়ন হয়নি।

মুডি’স অ্যানালিটিকসের মতে, মার্কিন পরিবার ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলো কম সুদে ঋণ নেয়ার সুযোগ হারিয়েছে। হিসাব অনুযায়ী, সুদহার না কমায় একটি পরিবারের গড়ে প্রায় ১৫০ ডলারের অতিরিক্ত অর্থনৈতিক চাপ তৈরি হয়েছে। কিছু অর্থনীতিবিদ আবার আশঙ্কা করছেন, মূল্যস্ফীতির চাপ অব্যাহত থাকলে চলতি বছরের শেষ দিকে যুক্তরাষ্ট্রে সুদহার আরো বাড়ানো হতে পারে।

বেড়েছে উড়োজাহাজ ভাড়াও

জ্বালানি মূল্যবৃদ্ধির প্রভাব উড়োজাহাজ পরিবহন খাতেও পড়েছে। জেট ফুয়েলের দাম বেড়ে যাওয়ায় অনেক উড়োজাহাজ সংস্থা অতিরিক্ত ব্যয়ের একটি অংশ যাত্রীদের ওপর চাপিয়ে দিয়েছে।

জ্যান্ডির হিসাব অনুযায়ী, বিমান ভাড়া বাড়ায় একজন মার্কিন নাগরিককে গড়ে আরো প্রায় ১০০ ডলার অতিরিক্ত ব্যয় করতে হয়েছে।

যুদ্ধের খরচ বহন করছেন করদাতারাও

সরাসরি ভোক্তা ব্যয়ের বাইরে যুদ্ধ পরিচালনার ব্যয়ও শেষ পর্যন্ত করদাতাদের ওপরই বর্তায়। মুডি’স অ্যানালিটিকসের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযান পরিচালনায় যুক্তরাষ্ট্রকে প্রতিদিন অতিরিক্ত প্রায় ৫ কোটি ডলার ব্যয় করতে হচ্ছে। সামরিক ব্যয়ের অংশ হিসেবে প্রতিটি মার্কিন পরিবারের ওপর গড়ে প্রায় ২৫০ ডলারের অতিরিক্ত বোঝা তৈরি হয়েছে।

অন্যদিকে সিবিএস নিউজের সঙ্গে কথা বলা মার্কিন কর্মকর্তাদের এক অনুমান অনুযায়ী, এখন পর্যন্ত ইরান সংঘাতে যুক্তরাষ্ট্রের মোট ব্যয় প্রায় ৫ হাজার কোটি ডলারে পৌঁছেছে। তবে এ হিসাবে ক্ষতিগ্রস্ত সামরিক সরঞ্জাম ও অবকাঠামোর ব্যয় পুরোপুরি অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি।

অন্য গবেষণায়ও একই চিত্র

মুডি’স অ্যানালিটিকসের পাশাপাশি অন্যান্য গবেষণা প্রতিষ্ঠানও একই ধরনের ফল পেয়েছে। ব্রাউন ইউনিভার্সিটির গবেষকদের মতে, যুদ্ধ শুরুর পর থেকে যুক্তরাষ্ট্রের ভোক্তারা শুধু পেট্রল ও ডিজেলের জন্যই অতিরিক্ত ৬৪ বিলিয়ন ডলার ব্যয় করেছেন। পরিবারপ্রতি এ ব্যয়ের পরিমাণ প্রায় ৪৮৬ ডলার।

অন্যদিকে ইনস্টিটিউট অন ট্যাক্স অ্যান্ড ইকোনমিক পলিসি নামের গবেষণা প্রতিষ্ঠান পরিবারপ্রতি অতিরিক্ত জ্বালানি ব্যয়ের পরিমাণ হিসাব করেছে প্রায় ৪২৮ ডলার।

যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যৌথভাবে ইরানের সরকারি ও সামরিক স্থাপনায় হামলা চালায়। ওই হামলায় ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি নিহত হন। এরপর ইরান কার্যত হরমুজ প্রণালি বন্ধ করে দেয়। বিশ্বের তেল ও প্রাকৃতিক গ্যাস পরিবহনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নৌপথটি বন্ধ হয়ে যাওয়ায় আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারে তৈরি হয় ব্যাপক অস্থিরতা।

আরও